হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক আছে। তারা ইতোমধ্যে কবরে আছে। কবরে যেতে বাধ্য করছি আমরা। সেই লেভেলের সাংবাদিকতা আমরা করিÑএভাবেই বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের খবর প্রকাশের হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করে কথিত সাংবাদিক মেহেদী হাসান।
কথিত সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি করছে মেহেদী হাসান নামে এক যুবক। নিজেকে অগ্রযাত্রা প্রতিদিন নামে একটি পত্রিকার পরিচয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হানা দেয় এ প্রতারক। দাবিকৃত টাকা না নিলে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের হুমকি দেয়। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রতি মতিঝিল থানায় জিডি করেছেন একটি হাউজিং কোম্পানি। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয়ধারী এই ব্যক্তি এখন সাংবাদিকতার আড়ালে ব্ল্যাকমেইলিং ও চাঁদাবাজিতে জড়িত।
সম্প্রতি মেহেদী হাসানের একটি অডিও রেকর্ড এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। অডিও রেকর্ডে সে এক ভুক্তভোগীকে বলে, রাতে ফোন দিয়েছিলাম, আপনি ফোনটা ধরলেন না। আপনি আপনার মতো বিচরণ করবেন, আমরা আমাদের মতো এ্যাটাক করব। এই খেলায় যদি চলতে থাকে। বলা হয়েছিল আপনি আমাদের অফিসে আসেন। এতটুকু ভরসা রাখেন, আপনার লস হবে না। চেষ্টা করবো কন্টিনিউসলি আপনাদের পাশে থাকার, মিডিয়া সাপোর্টটি দেয়ার। আপনার প্রতিষ্ঠানের একটি বিজ্ঞাপনও দিয়ে দিয়েন সাথে। আমি বাড়তি সাপোর্ট দিবনি। এটা সম্পাদক বলছে তো, এর ওপর কথা বলার সাহস আমার নেই। আর সাংবাদিকরাও ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। এতে আপনার লস হবে না।
এদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভুয়া ও মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করে মানহানি এবং দাপ্তরিক কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে কথিত সাংবাদিক মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে আগে সে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের নেতা মিজান-মহিউদ্দিন গ্রুপের অনুসারী ছিলো। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি সাংবাদিক পরিচয়ে অধিদপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করছেন সেই সাথে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দাবি পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেয় সে।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, মেহেদী হাসান এখন সাংবাদিক পরিচয়ে নিয়মিত অফিসে আসে। নানা ধরনের অবৈধ কাজ বৈধতা দিয়ে দিতে বলেন। তার দাবি পূরণ না করলে পরদিন অনলাইন নিউজপোর্টালে আমাদের বিরুদ্ধে মনগড়া সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এতে আমাদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। আমাদের দিয়ে তার কথা মতো কোনো বিষয় না করে দিলে সে এগুলো করে।
অন্য এক কর্মকর্তা জানান, সে ছাত্রলীগের সময়কার পরিচয় ব্যবহার করে একসময় ভয় দেখাতো। এখন আবার তার কোনো অবৈধ কাজ না করে দিলে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্ল্যাকমেইল করছে। এতে পুরো অফিসে খারাপ প্রভাব পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এই চাঁদাবাজ সাংবাদিক নামধারী ছাত্রলীগের ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তারা শিগগিরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন জানাবেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন ব্যক্তি অফিসে প্রবেশ করে কর্মকর্তাদের হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইল করতে না পারে।
একাধিক ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীর অভিযোগ, মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে সাংবাদিক পরিচয়ে সংঘবদ্ধ কয়েকটি চক্র ব্যাংকার, সরকারি কর্মকর্তা, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে আসছে। দেশের প্রথম সারির একটি ব্যাংকের ব্যাবস্থাপনা পরিচালককে ব্ল্যাকমেইল করে চাদাবাজির উদ্দেশ্য হাসিল করার লক্ষ্যে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভুঁইফোড় নামসর্বস্ব অগ্রযাত্রা প্রতিদিন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ঐ ব্যবস্থাপনা পরিচালককে মেহেদী হাসান ম্যাসেজ লিখেÑ ‘ মোট ৫ হাজার কপি বাড়তি ছাপানো হয়েছে আজ। আপনি নিজের অপকর্ম ধামাচাপা দিতে আমাদের একটা ভিডিও নিউজ হ্যাক করিয়ে বড় অপরাধ করেছেন, এর জবাব আপনাকে দিতে হবে। দেখতে থাকুন। পরে এসব নিউজ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। সেই টাকা কথিত সাংবাদিকরা মিলে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী বলেন, আমার ছোট বোনের স্বামীর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নামসর্বস্ব অগ্রযাত্রা প্রতিদিন পত্রিকায় কথিত সাংবাদিক মেহেদি হাসান সংবাদ প্রকাশ করেন। এরপর ভয়ভীতি দেখিয়ে দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর আবার আমার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই চক্রটি বিভিন্ন সময় সাধারণ মানুষদের টার্গেট করে সংবাদ প্রকাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়ি, কারখানা থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজি করেন। এরই মাঝে মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।
এদিকে মেহেদীর হয়রানি থেকে রেহাই পেতে ডিএমপির মতিঝিল থানায় ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানায় জিডি করেছে পুষ্পধারা প্রপার্টিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের পাবলিক রিলেশন অফিসার। ওই জিডিতে উল্লেখ করা হয়, নিজেকে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন অনলাইন এবং সাপ্তাহিক পত্রিকার একজন সংবাদকর্মী/প্রতিনিধি পরিচয়ে মেহেদী তাদের প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন করতে এবং ব্যবসায়িক ক্ষতিসাধনের অসৎ উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য সম্বলিত সংবাদ সম্প্রচার ও তাদের পত্রিকার অনলাইন পেইজে লেখালেখি করছে। তাদের অনলাইন পত্রিকায় মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে পুষ্পধারা হাউজিং এর নামে চলছে দেলোয়ার ও মাইনুদ্দিনের ভয়ঙ্কর প্রতারণা- ১ম পর্ব শীর্ষক শিরোনামে তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য সংবলিত একটি ভিডিও সহ সংবাদ প্রকাশ করেছে। যার ফলশ্রুতিতে ওই প্রতিষ্ঠানের এবং প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এছাড়া মেহেদী বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে আসছে।